আরও ১৫ দফতরের এখতিয়ার চান ডিসিরা, চান বিচারিক ক্ষমতাও

0
517

প্রতিবছরের মতো এবারও জেলা প্রশাসকদের নিয়ে হতে যাচ্ছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন। এবারের ডিসি সম্মেলন অন্যবারের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম। কারণ প্রতি বছর তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও এবার দুই দিন বাড়িয়ে পাঁচ দিন করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এবং তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে দেশের ৬৪ জেলার ডিসিদের আলোচনা হবে।

আগামীকাল ১৪ জুলাই, রবিবার থেকে ১৮ জুলাই, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডিসি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘শাপলা’ হলে সম্মেলন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পাঁচ দিনে মোট ২৯টি অধিবেশন

এবার সম্মেলনে ৫৪টি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও দফতর সম্পর্কে মোট ৩৩৩টি প্রস্তাব দিয়েছেন ডিসিরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগ সম্পর্কিত ২৯টি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২৬টি ও ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত ২০টি। সম্মেলনে মোট অধিবেশন হবে ২৯টি, আর কার্য অধিবেশন হবে ২৪টি।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, এবারের সম্মেলনে প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জোরদার করা, শিক্ষার মানোন্নয়ন ইত্যাদি।

প্রধান বিচারপতি, স্পিকার এবং তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে আলোচনা

পাঁচ দিনব্যাপী এবারের সম্মেলনে নতুনত্ব হলো মন্ত্রণালয়ভিত্তিক আলোচনার পাশাপাশি স্পিকার (ওই সময় স্পিকার বিদেশ থাকায় ডেপুটি স্পিকার দায়িত্বে থাকবেন), প্রধান বিচারপতি ও তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গেও আলোচনা হবে ডিসিদের।

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ডিসিদের রুদ্বদ্ধার বৈঠক

আগামী ১৬ জুলাই, মঙ্গলবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসতে যাচ্ছেন নির্বাহী বিভাগের ৯৪ জন কর্মকর্তা। এদের মধ্যে রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২২ কর্মকর্তা, দেশের ৮ বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ ডিসি।

তবে এ সময় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন দেশের বাইরে থাকার কথা রয়েছে। তাই প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নেতৃত্বে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইতোমধ্যেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২২ কর্মকর্তা, ৮ বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জন জেলা প্রশাসকের নামসহ একটি তালিকা সুপ্রিম কোর্টে পাঠানো হয়েছে।

হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. গোলাম রাব্বানী জানিয়েছেন, ১৬ জুলাই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে রুদ্বদ্বার বৈঠক হবে। আর এ জন্য সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের আমন্ত্রণ জানানো হবে না। 

জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ডিসিদের ৩৩৩টি প্রস্তাব প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব প্রস্তাবের মধ্যে অন্তত ১৫টি প্রস্তাব রয়েছে, যেগুলো অন্য মন্ত্রণালয় বা দফতরের এখতিয়ার। এমনকি সংবিধানের সাংঘর্ষিক প্রস্তাবও সেখানে রয়েছে।

বিভিন্ন জেলার ডিসিদের আলোচিত কিছু প্রস্তাব

ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো কারণে নির্বাচন হতে দেরি হলে সেখানে ডিসিরা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতার প্রস্তাব দিয়েছেন চট্টগ্রামের ডিসি। জেলায় পুলিশ সুপারের (এসপি) বাইরে আলাদা পুলিশ ফোর্স, উপজেলার প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন অফিসারকে (পিআইও) উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) অধীনে আনার প্রস্তাব করেছেন তারা।

জেলা-উপজেলায় আয়কর আদায়, ফৌজদারি অপরাধ বিচারের ক্ষমতা, কোটি টাকার থোক বরাদ্দ, এনজিও কার্যক্রম তদারকি, ডিপিপি প্রণয়ন, মোবাইল কোর্টের অধীনে নতুন নতুন আইন অন্তর্ভুক্তকরণ, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কমিটিতে ডিসিদের সভাপতি, উপজেলা শিক্ষা কমিটিতে ইউএনওদের সভাপতি করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আয়করের আওতা বাড়ানোর জন্য জেলা পর্যায়ে ডিসি এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওকে সভাপতি করে কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন মাদারীপুরের ডিসি।
  • ডিসিদের নিরাপত্তায় এক প্লাটুন সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন কুমিল্লা, কক্সবাজার, বাগেরহাট ও চুয়াডাঙ্গার ডিসি।
  • উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) উপজেলা প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন অফিসারের (পিআইও) বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) লেখার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন গোপালগঞ্জের ডিসি।
  • জেলায় এনজিওর মাধ্যমে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় সেগুলোরও নিয়ন্ত্রণ চান ডিসিরা। নারায়ণগঞ্জ ও গাইবান্ধা ডিসি তাদের প্রস্তাবে বলেছেন, জেলা পর্যায়ে এনজিও কার্যক্রমের সার্বিক সমন্বয় না থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন হয় না।
  • কক্সবাজারের ডিসি তার প্রস্তাবে দেশব্যাপী জেলা বাজেট প্রণয়নে ডিসিদের ক্ষমতা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে যুক্তি দেখিয়েছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে বাজেট প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করায় ডিসিরা ঠিকভাবে অবহিত থাকেন না। প্রস্তাবে তিনি বলেছেন, এলজিইডি, গণপূর্ত, স্থানীয় সরকারসহ সব দফতরে গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জেলার চাহিদা অনুযায়ী কম বরাদ্দ ও ব্যয় সম্পর্কে ডিসিরা অবহিত থাকেন না। ফলে জনসাধারণের কাছে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সার্বিক চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায় না।
  • উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রণয়নের ক্ষমতা ডিসিদের দেওয়ার জন্য দাবি জানিয়েছেন চাঁদপুরের ডিসি।
  • জেলার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে গৃহীত এক কোটি টাকার ওপরের প্রকল্প হলে ডিসিদের অনুমতি নেওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন গোপালগঞ্জের ডিসি।
  • প্রতিবছর অন্তত এক কোটি টাকা স্বাধীনভাবে খরচ করতে থোক বরাদ্দ চেয়েছেন ডিসিরা।
  • সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর অধীনে ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য ‘জনপ্রশাসন ব্যাংক’ নামে একটি আলাদা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছেন নোয়াখালীর ডিসি।
  • সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ‘বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছেন নরসিংদীর ডিসি।
  • এবারের সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে জেলা পরিষদ নিয়ে রাখা একমাত্র প্রস্তাবটি হচ্ছে পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সচিবকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা অর্পণ করা। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও নোয়াখালীর ডিসির এই প্রস্তাবেও মূলত আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার পরিধি বাড়ানোকেই উৎসাহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত জেলা কমিটি পুনর্বিন্যাস করে সংসদ সদস্যকে উপদেষ্টা ও ডিসিদের সভাপতি করার প্রস্তাব, উপজেলা শিক্ষা কমিটি পুনর্গঠন করে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে উপদেষ্টা ও ইউএনওকে সভাপতি করার প্রস্তাব করেছেন ঝালকাঠির ডিসি। 

ফৌজদারি অপরাধ আমলে নিয়ে বিচারিক ক্ষমতা চান ডিসিরা

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে। সমাজের নানা পর্যায়ে সংঘটিত ফৌজদারি অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা চান প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বর্তমানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতার বাইরে ম্যাজিস্ট্রেটদের সামনে কোনো অপরাধ হলে তারা তা আমলে নিতে পারেন না। ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। এ জন্য তারা সিআরপিসির ১৯০(৪) ধারা মতে, অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা চান প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

বিশেষ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৮, ১০৮, ১১০, ১৪৪, ১৪৫ ও ১৪৭ ধারার ক্ষমতা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অর্পণের এখতিয়ার সরকারের পাশাপাশি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়ার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।

যদিও এর আগেও ফৌজদারি অপরাধ আমলে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিচারিক ক্ষমতা চেয়েছেন ডিসিরা। তবে এই প্রস্তাবকে সংবিধানবিরোধী বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা হয়ে গেছে। এখন মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯ অনুযায়ী, যে আদালত নির্বাহী বিভাগ পরিচালনা করছেন সেটিও হাইকোর্ট বাতিল করে দিয়েছে হাইকোর্ট। 

২০১৭ সালের ১১ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত সংক্রান্ত ২০০৯ সালের আইনের ১১টি ধারা ও উপধারা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এই আইনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অবৈধ ঘোষণাও করেছেন আদালত। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। বর্তমানে বিষয়টির আপিল শুনানি চলমান রয়েছে। 

জানা গেছে, বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার ডিসিরা ঢাকায় অবস্থান করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here